
ডেঙ্গু থেকে সেরে ওঠার পরও শরীরে কিছু উপসর্গ দেখা দিতে পারে। জ্বর কমে যাওয়ার কয়েক সপ্তাহ বা মাস পর বালিশে, গোসলের সময় কিংবা চিরুনিতে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি চুল দেখতে পান অনেকে। এতে উদ্বেগ তৈরি হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, গুরুতর সংক্রমণের পর এভাবে চুল ঝরে পড়ার একটি সাধারণ কারণ হতে পারে সাময়িক একটি অবস্থা, যার নাম টেলোজেন এফ্লুভিয়াম। এ ক্ষেত্রে চুলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি চক্রে পরিবর্তন আসে এবং একপর্যায়ে বেশি চুল ঝরে পড়ে।
ডেঙ্গুর পর কেন চুল পড়তে পারে, এটি স্থায়ী কি না এবং এ সময়ে চুলের যত্নে কী করা প্রয়োজন, তা জেনে নেওয়া যাক।
ডেঙ্গুর পর চুল পড়ার কারণ কী?
চুলের গোড়া স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি, বিশ্রাম ও ঝরে পড়ার কয়েকটি পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যায়। তবে উচ্চ জ্বর, সংক্রমণ, ক্ষুধামন্দা, পানিশূন্যতা, মানসিক চাপ কিংবা হঠাৎ ওজন কমে যাওয়ার মতো শারীরিক ধকল এই স্বাভাবিক চক্রে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। তখন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি চুলের গোড়া বিশ্রাম পর্যায়ে চলে যায়। এর কিছুদিন পর ওই চুলগুলো ঝরে পড়তে শুরু করে।
এ ধরনের চুল পড়ার একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, এটি সাধারণত অসুস্থতার সময়ই শুরু হয় না। ডেঙ্গু থেকে সেরে ওঠার প্রায় দুই থেকে চার মাস পর চুল পড়া বেশি চোখে পড়তে পারে। এ কারণে অনেকে মনে করেন, চুল পড়ার পেছনে নিশ্চয়ই অন্য কোনো কারণ রয়েছে। তবে শারীরিক ধকলের প্রতি চুলের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ার অংশ হিসেবেও এমনটি হতে পারে।
ডেঙ্গুর পর চুল পড়া কি স্থায়ী?
ডেঙ্গুর পর অতিরিক্ত চুল ঝরতে শুরু করলে অনেকের মনেই স্থায়ীভাবে চুল হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়। তবে টেলোজেন এফ্লুভিয়ামের ক্ষেত্রে সাধারণত চুলের গোড়া স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। এ অবস্থায় মাথার নির্দিষ্ট কোনো অংশে গোলাকার টাক পড়ার বদলে পুরো মাথাজুড়ে চুল পাতলা হয়ে আসতে পারে।
চুলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি চক্র আবার ঠিক হয়ে এলে নতুন চুল গজাতে শুরু করে। তবে মাথার চুল ধীরে বাড়ে বলে আগের ঘনত্ব ফিরে পেতে সময় লাগতে পারে।
তারপরও ডেঙ্গুর পর চুল পড়ার সব ঘটনাকে সংক্রমণের ফল বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। শরীরে আয়রনের ঘাটতি, থাইরয়েডের সমস্যা, খাবারে পর্যাপ্ত প্রোটিনের অভাব, দ্রুত ওজন কমানোর চেষ্টা, হরমোনের পরিবর্তন কিংবা বংশগত কারণে চুল পাতলা হওয়ার সমস্যাও এর পেছনে থাকতে পারে।
চুল অতিরিক্ত ঝরলে, দীর্ঘদিন ধরে এ সমস্যা চলতে থাকলে অথবা চুল পড়ার সঙ্গে অন্য কোনো উপসর্গ দেখা দিলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক সম্ভাব্য কারণগুলো পরীক্ষা করে দেখতে পারেন।
ডেঙ্গু থেকে সেরে ওঠার পর খাদ্যাভ্যাসে যা খেয়াল রাখবেন
চুলের প্রধান উপাদান কেরাটিন, যা একধরনের প্রোটিন। তাই অসুস্থতার পর শরীরের পুষ্টির চাহিদা পূরণে পর্যাপ্ত প্রোটিন খাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য খাদ্যতালিকায় ডাল, শিম, ছোলা, সয়াবিন, টোফু, পনির, দই, দুধ, ডিম, মাছ কিংবা চর্বিহীন মাংস রাখা যেতে পারে।
চুলের স্বাস্থ্যের জন্য আয়রনও গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে শরীরে এ উপাদানের ঘাটতি থাকলে। মসুর ডাল, শিম, সবুজ শাকসবজি, তিলসহ বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ খাবার থেকে আয়রন পাওয়া যায়।
উদ্ভিজ্জ খাবার থেকে পাওয়া আয়রন শরীরে ভালোভাবে শোষিত হতে ভিটামিন সি সহায়তা করে। তাই আয়রনসমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে পেয়ারা, আমলকী, লেবু, টমেটো কিংবা ক্যাপসিকামের মতো ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া যেতে পারে।
তবে কোনো একটি বিশেষ খাবার খেলেই ডেঙ্গুর পর চুল পড়া দ্রুত বন্ধ হয়ে যাবে, এমনটি নয়। বরং সুষম খাদ্য গ্রহণ এবং শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করাই গুরুত্বপূর্ণ।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া বেশি মাত্রায় আয়রন, বায়োটিন, জিঙ্ক কিংবা ভিটামিন ডি সেবন করা উচিত নয়। শরীরে ঘাটতি আছে কি না, তা নিশ্চিত না হয়ে এসব পুষ্টি উপাদানের সম্পূরক গ্রহণ করলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। কিছু সম্পূরক নির্দিষ্ট চিকিৎসা পরীক্ষার ফলাফলকেও প্রভাবিত করতে পারে।
ডেঙ্গুর পর চুলের যত্ন নেবেন যেভাবে
ডেঙ্গু থেকে সেরে ওঠার পরও নিয়মিত চুল ধোয়া যায়। শ্যাম্পু ব্যবহারের কারণে টেলোজেন এফ্লুভিয়াম হয় না। বরং আগে থেকেই ঝরে পড়ার পর্যায়ে থাকা চুল গোসল বা চুল ধোয়ার সময় আলগা হয়ে বেরিয়ে আসতে পারে। তাই চুল পড়ার ভয়ে চুল ধোয়া বন্ধ করার প্রয়োজন নেই।
এ সময়ে চুলের সঙ্গে কোমল আচরণ করা জরুরি। বিশেষ করে ভেজা চুলে জোরে চিরুনি চালানো বা টান দেওয়া এড়িয়ে চলতে হবে। আঁটসাঁট করে চুল বাঁধা, অতিরিক্ত তাপ প্রয়োগ, ঘন ঘন রাসায়নিক উপাদান দিয়ে চুলের পরিচর্যা এবং তোয়ালে দিয়ে জোরে ঘষার অভ্যাস চুল ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এতে চুল আরও পাতলা দেখাতে পারে।
অসুস্থতার পর দ্রুত ওজন কমানোর জন্য কঠোর খাদ্যনিয়ন্ত্রণ বা ক্র্যাশ ডায়েটিংও এড়িয়ে চলা উচিত। সংক্রমণ থেকে সেরে ওঠার সময় শরীরের পর্যাপ্ত শক্তি ও পুষ্টি প্রয়োজন।
পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম এবং ধীরে ধীরে স্বাভাবিক দৈনন্দিন কাজে ফিরে যাওয়া সুস্থ হয়ে উঠতে সহায়তা করে। তবে এসব অভ্যাস অনুসরণ করলেই সঙ্গে সঙ্গে চুল পড়া বন্ধ হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
ডেঙ্গুর পর চুল পড়া অনেক ক্ষেত্রে সাময়িক হলেও সমস্যাটি দীর্ঘস্থায়ী হলে বা চুল অস্বাভাবিক হারে ঝরতে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। মাথার নির্দিষ্ট স্থানে টাকের মতো ফাঁকা হয়ে যাওয়া কিংবা অন্য কোনো শারীরিক উপসর্গ দেখা দিলেও পরীক্ষা করানো জরুরি।
সঠিক কারণ শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া গেলে চুলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ফিরে আসতে সহায়তা পাওয়া যায়।



